8. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পোশাক-পরিচ্ছদ

【1】

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় পোষাক ছিল কামীস

উম্মে সালামা (রাঃ) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) পোষাক হিসেবে ‘কামীস’ বা জামা সর্বাধিক পছন্দ করতেন। [৪৫] ব্যাখ্যা : বিভিন্ন হাদীসের ভিত্তিতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিভিন্ন ধরনের জামা পরিধান করতেন। তার কোনটির দৈর্ঘ্য ছিল টাখনু অবধি। কোনটি কিছুটা ছোট, যা হাটুর নিমভাগ পর্যন্ত ছিল। আবার কোনটির হাতা ছিল হাতের আঙ্গুলের প্রান্ত পর্যন্ত লম্বা। কোনটির হাতা কিছুটা ছোট, যা কব্জি পর্যন্ত ছিল। পুরুষের পোশাক পরিধানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)একটি বিশেষ দিক অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি পুরুষের পোশাকের নিচের অংশ পায়ের গোড়ালী থেকে উপরে রাখার আদেশ করেছেন এবং গোড়ালীর নিচে পাজামা, লুঙ্গি, জামা বা কোন পোশাক পরিধান করতে হারাম ঘোষণা করেছেন। সর্বদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর লুঙ্গি ও জামা টাখনুর' উপরে থাকত। সাধারণত তিনি পোশাকের নিচের অংশ হাটু ও গোড়ালীর বরাবর বা নিসফে সাক’ পর্যন্ত পরিধান করতেন। বিভিন্ন হাদীসে তিনি মুসলিম উম্মাহর পুরুষগণকে এভাবে পোশাক পরিধান করতে আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং মুসলিম পুরুষের জন্য স্বেচ্ছায় টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করা হারাম। আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও অন্যান্য সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, যে ব্যাক্তি দাম্ভিকতার সাথে নিজের পোশাক ঝুলিয়ে পরিধান করবে , আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। [৪৬] মু’আবিয়া ইবনে কুররা (রাঃ) তিনি বলেন, আমি মুযায়না গোত্রের একদল লোকের সাথে বায়’আত গ্রহণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে উপস্থিত হলাম। এ সময় তার জামার বোতাম খোলা ছিল। আমি তখন (বরকত লাভ করার জন্য) জামার ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করলাম [৪৭] ব্যাখ্যা : বিভিন্ন হাদীসের আলোকে মনে হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর জামার বোতাম ছিল। তবে তিনি সাধারণত বোতাম লাগাতেন না। ফলে জামার ভেতর হাত প্রবেশ করিয়ে পিঠের মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করা সহজ ছিল।

【2】

তিনি ইয়ামেনী নকশী কাপড়ও পরিধান করতেন

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) একদা নবী (সঃ) উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর কাধে ভর করে বাইরে বের হলেন। এ সময় তার দেহে পরা ছিল একটি ইয়ামেনী নকশী কাপড়। তারপর তিনি লোকদের নামাযের ইমামতি করেন। [৪৮] ব্যাখ্যা : রাসূলুল্লাহ (সঃ) অসুস্থতার কারণে উসামা (রাঃ) এর কাধে ভর করে এসেছিলেন।

【3】

তিনি নতুন কাপড় পরিধানকালে কাপড়ের নাম উচ্চারণ পূর্বক দু’আ পাঠ করতেন

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন নতুন কাপড় পরিধান করতেন তখন কাপড়ের নাম পাগড়ি অথবা কামীস অথবা চাদর ইত্যাদি উচ্চারণ করতেন। তারপর তিনি এ দুআ পড়তেনঃ অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমারই জন্য যাবতীয় প্রশংসা। যেহেতু তুমিই আমাকে তা পরিধান করিয়েছ। আমি তোমার কাছে এর কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আরো কল্যাণ চাচ্ছি যে উদ্দেশে এটা তৈরি করা হয়েছে তার। আর আমি তোমার স্মরণাপন্ন হচ্ছি এর যাবতীয় অনিষ্ট হতে এবং যে উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে। [৪৯] ব্যাখ্যা : যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) কোন নতুন জামা পরিধান করতেন, তখন আনন্দ প্রকাশার্থে তার নাম নির্ধারণ করতেন। যেমন- বলতেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ জামাটি বা পাগড়িটি দান করেছেন। তারপর দুআ পাঠ করে পরিধান করতেন।

【4】

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি প্রিয় পোষাক ছিল হিবারা

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কাপড় হলো (ইয়ামানে তৈরি চাদর) হিবারা। [৫০] ব্যাখ্যা : সে সময়ে পোশাকের বিখ্যাত স্থান ইয়ামানের তৈরি ডোরা ও কারুকার্য সম্বলিত সূতী বা কাতান প্রকৃতির চাদরকে হিবারা বলা হতো। এগুলো কখনো লাল, কখনো নীল, আবার কখনো সবুজ ডোরাকাটা হতো।

【5】

তিনি লাল রঙ্গের নকশী করা চাদরও পরিধান করতেন

আবু জুহাইফা (রাঃ) তিনি বলেন, আমি নবী (সঃ) কে লাল নকশী চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি। আজও যেন আমি তার উভয় গোড়ালীর ঔজ্জ্বল্য প্রত্যক্ষ করছি। [৫১] বারা ইবনে আযিব (রাঃ) তিনি বলেন, ‘লাল হুল্লা' পরিহিত কাউকে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ এর চেয়ে অধিক সুদর্শন দেখিনি। আর তার কেশ (জুম্মা) উভয় কাঁধ স্পর্শ করছিল। [৫২] ব্যাখ্যাঃ এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সেলাই ছাড়া লুঙ্গি ও চাদর। এগুলো তৎকালীন আরব দেশের সর্বাধিক ব্যবহৃত পোশাক ছিল। এটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)sঞ্জ সর্বাধিক ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ বলেছেন, চাদর ও লুঙ্গি একই প্রকারের একই রংয়ের প্রস্তুত হলে তাকে حُلَّةٌ বলে।

【6】

তিনি সবুজ চাদরও পরিধান করতেন

আবু রিমছা (রাঃ) তিনি বলেন, আমি নবী (সঃ) ত্রকে দুটি সবুজ চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। [৫৩] ব্যাখ্যা : রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎকালীন সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন রংয়ের পোশাক পরিধান করেছেন। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, তার মধ্যে সবুজ, সাদা ও মিশ্রিত রং তিনি পছন্দ করতেন।

【7】

তিনি সাহাবীদেরকে সাদা রঙের কাপড় পরিধান করতে উপদেশ দিয়েছেন

ইবনে আব্বাস (রাঃ) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা সাদা রঙের কাপড় পরিধান করবে। তোমাদের যেন সাদা কাপড় পরিধান করে এবং মুক্তদেরকে সাদা কাপড় দিয়ে দাফন দেয়। কেননা, সাদা কাপড় তোমাদের সর্বোত্তম পোশাক। [৫৪] সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো। কারণ, তা সর্বাধিক পবিত্র ও উত্তম। আর তা দিয়েই তোমরা মৃতদের কাফন দাও। [৫৫]

【8】

তিনি কালো রঙের পশমী চাদরও পরিধান করতেন

আয়েশা (রাঃ) তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যুষে বাইরে বের হন। তখন তার দেহে কালো পশমের একটি চাদর শোভা পাচ্ছিল। [৫৬]

【9】

তিনি আঁটসাঁট আস্তিন বিশিষ্ট রুমী জুব্বা পরিধান করেছিলেন

মুগীরা ইবনে শু’বা তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সঃ) আটসাঁট আস্তিন বিশিষ্ট একটি রুমী জুব্বা পরিধান করেন। [৫৭] ব্যাখ্যা : রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন যে পোশাক পেয়েছেন তাই ব্যবহার করেছেন। তিনি সুতি, পশমী ও কাতানের তৈরি প্রভৃতি পোশাক ব্যবহার করেছেন। সবুজ, লাল, হলুদ, সাদা, কালো ও মিশ্রিত যখন যে রংয়ের পোশাক পেয়েছেন পরিধান করেছেন। কারণ আরবে কোন পোশাক তৈরি হতো না। এগুলো মক্কা-মদিনার বাইরে সিরিয়া, ইয়ামান প্রভৃতি দেশে তৈরি হতো। তাই ব্যবসায়ীগণ যে পোশাক আনতেন তাই সাধ্যমতো ক্রয় করে বা উপহার হিসেবে যা পেতেন তাই ব্যবহার করতেন ।